২০২৫ সালে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৮২.৮ মিলিয়নে। মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার এখন ১১৯ মিলিয়নের বেশি। অন্যদিকে বৈশ্বিক ডিজিটাল মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রির মূল্য ২০২৫ সালেই ছাড়িয়ে গেছে ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এটি ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে IMARC Group।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এগুলো আসলে একটি বার্তা। বাংলাদেশের ক্রেতারা এখন অনলাইনে। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গা এখন স্ক্রিনে। তাহলে আপনার ব্যবসার অবস্থান কোথায়?
ডিজিটাল মার্কেটিং এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর। এটি কোনো ট্রেন্ড নয়, এটি এখনকার বাস্তবতা। এই আর্টিকেলে আমরা সহজ ভাষায় জানব ডিজিটাল মার্কেটিং কি, এটি কীভাবে কাজ করে, কত প্রকার, এবং বাংলাদেশের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে কেন এটি আপনার জন্য এখনই জরুরি।
ডিজিটাল মার্কেটিং কি?
অনেকেই মনে করেন ডিজিটাল মার্কেটিং মানে শুধু Facebook-এ বিজ্ঞাপন দেওয়া। এই ধারণাটি আংশিক সত্য, কিন্তু পুরো চিত্র নয়।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, ডিজিটাল মার্কেটিং হলো ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে আপনার পণ্য বা সেবার প্রচার করার প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় সার্চ ইঞ্জিন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইল, ওয়েবসাইট, কন্টেন্ট এবং পেইড বিজ্ঞাপন সহ একাধিক মাধ্যম একসাথে কাজ করে।
American Marketing Association-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, ডিজিটাল মার্কেটিং বলতে বোঝায় যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে পরিচালিত মার্কেটিং পদ্ধতি, যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট, সার্চ ইঞ্জিন, ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও এবং ইমেইলের মাধ্যমে তাদের গ্রাহকদের কাছে পৌঁছায়।
ব্যাপারটা আরও সহজ করা যাক। আপনার পাড়ার মুদি দোকানদার যদি WhatsApp-এ অফার পাঠান, সেটাও এক ধরনের ডিজিটাল মার্কেটিং। আবার একটি বড় কোম্পানি যখন Google-এ সার্চ বিজ্ঞাপন চালায়, সেটাও ডিজিটাল মার্কেটিং। পার্থক্য শুধু স্কেলে, কৌশলে নয়।
ডিজিটাল মার্কেটিং কখন শুরু হয়েছিল?
অনেকে ভাবেন ডিজিটাল মার্কেটিং খুব সাম্প্রতিক বিষয়। আসলে এর শিকড় আরও গভীরে।
১৯৭১ সালে Ray Tomlinson প্রথম ইমেইল পাঠান। এরপর ১৯৭৮ সালে Gary Thuerk নামের এক মার্কেটার ARPANET-এ ৪০০ জনকে একসাথে ইমেইল পাঠিয়ে ১৩ মিলিয়ন ডলারের বিক্রয় করেন। সেটিই ছিল পৃথিবীর প্রথম মাস ইমেইল মার্কেটিং ক্যাম্পেইন।
১৯৯০ সালে World Wide Web চালু হয়। তারপর ১৯৯৪ সালে AT&T প্রথম ক্লিকযোগ্য ব্যানার বিজ্ঞাপন চালু করে HotWired-এ। সেই বিজ্ঞাপনের click-through rate ছিল ৪৪%, যা আজকের দিনে কল্পনাতীত।
১৯৯৮ সালে Google আসে। ২০০৪ সালে Facebook চালু হয়। ২০০৫ সালে YouTube। ২০০৭ সালে iPhone। এই প্রতিটি মাইলফলক ডিজিটাল মার্কেটিংকে নতুন আকার দিয়েছে। এবং এই বিকাশ এখনও থামেনি, বরং AI-এর যুগে এটি আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং কীভাবে কাজ করে?
ডিজিটাল মার্কেটিং কোনো জাদুর কাঠি নয়। ডিজিটাল মার্কেটিং কাজ করে একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া যা তিনটি মূল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রথমত, সঠিক মানুষকে চেনা। আপনার পণ্য কে কিনবে? তার বয়স কত? সে কোন সময়ে অনলাইনে থাকে? সে কী ধরনের কন্টেন্ট পছন্দ করে? ডিজিটাল মার্কেটিং এই তথ্যগুলো Data-র মাধ্যমে সংগ্রহ করে এবং সেই অনুযায়ী message পাঠায়।
দ্বিতীয়ত, সঠিক মাধ্যম বেছে নেওয়া। কেউ Google-এ খোঁজে, কেউ Facebook-এ দেখে, কেউ YouTube-এ শেখে। আপনার ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সঠিক চ্যানেল নির্বাচনই ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে বড় কৌশল।
তৃতীয়ত, ফলাফল পরিমাপ করা। কতজন বিজ্ঞাপন দেখল, কতজন ক্লিক করল, কতজন কিনল। এই পুরো যাত্রাটি ডিজিটাল মার্কেটিং সংখ্যায় দেখাতে পারে, যা ঐতিহ্যবাহী মার্কেটিং কখনো পারে না।
ডিজিটাল মার্কেটিং কত প্রকার ও কী কী?
ডিজিটাল মার্কেটিং কোনো একক পদ্ধতি নয়। এটি একটি পরিবার, যেখানে একাধিক কার্যকর পদ্ধতি আছে। প্রতিটি পদ্ধতি ভিন্ন লক্ষ্যে, ভিন্ন শ্রোতাদের জন্য কাজ করে।
সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (SEO)
SEO হলো আপনার ওয়েবসাইটকে এমনভাবে তৈরি করা যাতে মানুষ Google-এ কিছু খুঁজলে আপনি প্রথমে দেখা যান। যেমন কেউ যদি “ঢাকায় সেরা শাড়ির দোকান” লিখে সার্চ করে, আর আপনার সাইট প্রথম পেজে আসে, তাহলে সেই ক্লিকের জন্য কোনো টাকা দিতে হয় না।
SEO-র ROI গড়ে ২২:১ অর্থাৎ ১ টাকা বিনিয়োগে ২২ টাকা ফেরত। এটি দীর্ঘমেয়াদী কিন্তু সবচেয়ে টেকসই পদ্ধতি।
সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং (SMM)
Facebook, Instagram, YouTube, TikTok, LinkedIn এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে আপনার ব্র্যান্ড তৈরি করা, গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং বিক্রয় করা হলো সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালের শেষে ৬৪ মিলিয়নের বেশি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠী সরাসরি আপনার সম্ভাব্য গ্রাহক।
কন্টেন্ট মার্কেটিং
ব্লগ পোস্ট, ভিডিও, ইনফোগ্রাফিক, পডকাস্ট এগুলোর মাধ্যমে আপনার সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাজের তথ্য দেওয়া এবং বিশ্বাস তৈরি করাই কন্টেন্ট মার্কেটিং। বিক্রয় না করে প্রথমে মূল্য দাও, এটাই এই পদ্ধতির দর্শন।
কন্টেন্ট মার্কেটিং ব্যবহারকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ঐতিহ্যবাহী মার্কেটিং-নির্ভর প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ৩ গুণ বেশি লিড পায় এবং খরচ হয় ৬২% কম।
ইমেইল মার্কেটিং
ইমেইল মার্কেটিং হলো ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে পুরনো এবং এখনো সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর একটি। Campaign Monitor-এর গবেষণা বলছে, ইমেইল মার্কেটিংয়ের ROI গড়ে ৪,২০০% অর্থাৎ ১ ডলার বিনিয়োগে ৪২ ডলার ফেরত।
আপনার বিদ্যমান গ্রাহকদের নতুন অফার, সিজনাল ডিসকাউন্ট বা প্রোডাক্ট আপডেট জানানোর জন্য এটি অত্যন্ত কম খরচের এবং ব্যক্তিগত পদ্ধতি।
পেইড অ্যাডভার্টাইজিং (PPC / Facebook Ads)
Google Ads বা Facebook Ads-এ সরাসরি টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন চালানো। এই পদ্ধতির সুবিধা হলো ফলাফল দ্রুত আসে। আজ ক্যাম্পেইন চালু করলে আজই ট্রাফিক বা বিক্রয় পাওয়া সম্ভব।
বাজেট ছোট হলেও শুরু করা যায়। এমনকি মাসে ৫,০০০ টাকা দিয়েও কার্যকর Facebook Ads পরিচালনা সম্ভব যদি টার্গেটিং সঠিক হয়।
অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং
অন্যের পণ্য বা সেবা প্রচার করে কমিশন আয় করার পদ্ধতি। অথবা উল্টোটাও সত্য। আপনার পণ্যের জন্য অ্যাফিলিয়েট পার্টনার তৈরি করলে তারা আপনার হয়ে মার্কেটিং করবে, বিক্রয় হলে কমিশন পাবে।
ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং
বাংলাদেশে এই পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। যাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় ফলোয়ার বেস আছে, তাদের মাধ্যমে পণ্য প্রচার করানো হলো ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং। বড় বাজেট ছাড়াও মাইক্রো-ইনফ্লুয়েন্সার (১০,০০০ থেকে ১ লাখ ফলোয়ার) দিয়ে শুরু করা সম্ভব এবং অনেক সময় এটি বেশি কার্যকর।
ডিজিটাল মার্কেটিং বনাম ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং- পার্থক্য কোথায়?
অনেক পুরনো ব্যবসায়ী মনে করেন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বা হ্যান্ডবিল ছাপানোই যথেষ্ট। চলুন সংখ্যায় দেখি দুটোর পার্থক্য কোথায়।
| বিষয় | ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং | ডিজিটাল মার্কেটিং |
| খরচ | অনেক বেশি (পত্রিকায় ফুলপেজ বিজ্ঞাপন ১ লাখ+ টাকা) | কম বাজেটেও শুরু সম্ভব |
| নাগাল | ভৌগোলিকভাবে সীমিত | সারা বাংলাদেশ বা বিশ্বব্যাপী |
| ফলাফল পরিমাপ | অনুমাননির্ভর, সঠিক ROI জানা কঠিন | রিয়েল-টাইম ডেটায় পরিষ্কার ফলাফল |
| টার্গেটিং | অনির্দিষ্ট | বয়স, আগ্রহ, অবস্থান অনুযায়ী নির্দিষ্ট |
| পরিবর্তন | একবার ছাপলে বদলানো যায় না | যেকোনো সময় পরিবর্তন সম্ভব |
| সময় | ধীর, সপ্তাহ বা মাস লাগে | দ্রুত, ঘণ্টার মধ্যে শুরু সম্ভব |
| যোগাযোগ | একমুখী | দ্বিমুখী, গ্রাহক সরাসরি কথা বলতে পারেন |
ট্র্যাডিশনাল মার্কেটিং একেবারে অকার্যকর নয়। তবে বাংলাদেশের ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং পরিমাপযোগ্য। গবেষণা বলছে বেশিরভাগ ব্যবসার জন্য ৬০-৭০% বাজেট ডিজিটালে এবং বাকি ৩০-৪০% ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়া যায়।
ডিজিটাল মার্কেটিং এর প্রয়োজনীয়তা কী?
এবার আসি মূল প্রশ্নে। কেন আপনার ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং এখনই দরকার?
কম খরচে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো
একটি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলে শুধু সেই পত্রিকার পাঠকরা দেখবেন। কিন্তু ফেসবুকে একটি ভালো পোস্ট বা সামান্য বুস্ট করা বিজ্ঞাপন হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটি বিনামূল্যে YouTube ভিডিও কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশে মাসে মাত্র ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকায় ভালো Facebook Ads ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা সম্ভব, যেটি একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপনের তুলনায় অনেক বেশি মানুষের কাছে এবং সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাবে।
সঠিক মানুষকে সঠিক সময়ে টার্গেট করা
এটি ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক। আপনি যদি ঢাকার ৩০-৪৫ বছর বয়সী, মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের কাছে শাড়ি বিক্রি করতে চান, তাহলে Facebook Ads ঠিক এই মানুষগুলোকেই দেখাবে।
Google Ads-এ কেউ যদি “হাতে বোনা কটন শাড়ি কিনব” লিখে সার্চ করেন, মানে সে ইতোমধ্যে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই মুহূর্তে আপনার বিজ্ঞাপন তার সামনে আসা মানে একটি প্রায়-নিশ্চিত বিক্রয়।
ব্যবসার ফলাফল পরিমাপ করা সম্ভব
আপনি কি জানেন আপনার পত্রিকার বিজ্ঞাপন দেখে কতজন দোকানে এসেছেন? প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে আপনি জানতে পারবেন।
- কতজন বিজ্ঞাপন দেখেছে
- কতজন ক্লিক করেছে
- কতজন ওয়েবসাইটে গেছে
- কতজন পণ্য কিনেছে
- কত টাকা বিনিয়োগে কত টাকা এসেছে
এই স্বচ্ছতাই ডিজিটাল মার্কেটিংকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য বিনিয়োগ করে তোলে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা
আপনার প্রতিযোগীরা ইতোমধ্যে ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ই-কমার্স মার্কেট ২০২৪ সালে ছিল ৯ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৯ সালের মধ্যে এটি ১৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াবে বলে প্রক্ষেপণ দিয়েছে DHL ও Statistica।
যারা এখন ডিজিটাল মার্কেটিং শুরু করবেন, তারা আগামী ৩-৫ বছরে বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করবেন। যারা করবেন না, তাদের পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
২৪/৭ ব্যবসা চালু রাখা
আপনার দোকান রাত ১০টায় বন্ধ হয়। কিন্তু আপনার ওয়েবসাইট, Facebook পেজ বা ই-কমার্স স্টোর রাত ২টায়ও অর্ডার নিতে পারে। ডিজিটাল মার্কেটিং আপনার ঘুমানোর সময়েও ব্যবসা করে।
এই ধারণাটিকে বলা হয় “passive marketing”। একবার ভালো কন্টেন্ট বানালে বা SEO করলে, সেটি মাসের পর মাস আপনার হয়ে কাজ করতে থাকে।
ব্র্যান্ড বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা
আজকের ক্রেতা কোনো পণ্য কেনার আগে অনলাইনে খোঁজে। আপনার ব্যবসার ওয়েবসাইট নেই, Google-এ রিভিউ নেই, Facebook পেজ নেই, তাহলে অনেক সম্ভাব্য গ্রাহক আপনাকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন না।
ডিজিটাল মার্কেটিং আপনার ব্র্যান্ডকে একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিচয় দেয়। নিয়মিত কন্টেন্ট, গ্রাহকদের রিভিউ, সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া উপস্থিতি একটি ব্র্যান্ডকে “সিরিয়াস ব্যবসা” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল মার্কেটিং কতটা বাস্তবসম্মত?
২০২৫ সালের তথ্য বলছে বাংলাদেশে মোট ১৩৩.৬১ মিলিয়ন ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার আছে, যার মধ্যে ১১৯.২৯ মিলিয়ন মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। স্মার্টফোন ব্যবহার ২০২৩ সালের ৬৩.৩% থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৭২.৮% হয়েছে।
বাংলাদেশের ই-কমার্স সেক্টর ২০২৫ সালে ৩০.১% প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ২০২৪-২০২৯ সময়কালে এই সেক্টরে বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হবে ১৭.৭%।
ফেসবুক বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ডিজিটাল মার্কেটিং প্ল্যাটফর্ম। ৬৪ মিলিয়ন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর বড় অংশই Facebook ব্যবহার করেন। এই প্ল্যাটফর্মে সঠিক টার্গেটিংয়ের মাধ্যমে একটি বুটিক হাউস, একটি খাবারের দোকান, বা একটি সফটওয়্যার কোম্পানি সবাই সমানভাবে উপকৃত হতে পারে।
বাংলাদেশে Google ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত। মানুষ এখন অনলাইনে খোঁজে “কোথায় ভালো ডাক্তার পাবো”, “সেরা বিরিয়ানি কোথায়”, “ঢাকায় বাড়ি ভাড়া”। এই সার্চগুলোকে কাজে লাগানোর সুযোগ সব ধরনের ব্যবসার আছে।
ডিজিটাল মার্কেটিং শিখতে কতদিন লাগে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আপনি কতটা গভীরে যেতে চান তার উপর।
প্রাথমিক স্তরে, Facebook Page পরিচালনা, Instagram কন্টেন্ট তৈরি বা WhatsApp Business সেটআপ করা যায় কয়েকদিনেই। এগুলো দিয়ে শুরু করা সম্ভব এবং অনেক ছোট ব্যবসা এটুকু দিয়েই ভালো ফলাফল পাচ্ছে।
মধ্যবর্তী স্তরে, Facebook Ads, Google Ads, কন্টেন্ট মার্কেটিং এবং SEO-র মৌলিক বিষয়গুলো শিখতে ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগতে পারে।
পেশাদার স্তরে, SEO বিশেষজ্ঞ, Google Ads-এ দক্ষতা বা ডিজিটাল মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিস্ট হতে ১ থেকে ২ বছরের অনুশীলন প্রয়োজন।
তবে আপনাকে সব নিজে শিখতে হবে না। অনেক ব্যবসায়ী ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের ধারণা বুঝেই ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সিকে দায়িত্ব দেন। এতে তাঁরা নিজের কোর ব্যবসায় মনোযোগ দিতে পারেন এবং বিশেষজ্ঞরা মার্কেটিং সামলান।
আপনার ব্যবসার জন্য ডিজিটাল মার্কেটিং কোথা থেকে শুরু করবেন?
শুরু করাটাই সবচেয়ে কঠিন মনে হয়। কিন্তু আসলে এটা অনেক সহজ করা যায় যদি সঠিক ধাপ মেনে চলা হয়।
প্রথম ধাপ: লক্ষ্য ঠিক করুন। আপনি কি বিক্রয় বাড়াতে চান? নতুন গ্রাহক চান? নাকি ব্র্যান্ড পরিচিত করতে চান? লক্ষ্য পরিষ্কার না থাকলে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করবেন সেটাও পরিষ্কার হবে না।
দ্বিতীয় ধাপ: আপনার গ্রাহক চিনুন। আপনার আদর্শ গ্রাহক কে? তার বয়স, পেশা, আয়, অনলাইন অভ্যাস কী? এই তথ্য যত স্পষ্ট থাকবে, মার্কেটিং তত কার্যকর হবে।
তৃতীয় ধাপ: একটি বা দুটি চ্যানেল দিয়ে শুরু করুন। সব প্ল্যাটফর্মে একসাথে যাবেন না। প্রথমে Facebook Page এবং Google My Business সেটআপ করুন। এই দুটো বিনামূল্যে এবং প্রায় সব ধরনের ব্যবসার জন্য কার্যকর।
চতুর্থ ধাপ: নিয়মিত কন্টেন্ট দিন। সপ্তাহে ৩-৪টি পোস্ট, মাঝে মাঝে ভিডিও, গ্রাহকদের প্রশ্নের উত্তর। ধারাবাহিকতাই এখানে সবচেয়ে বড় কৌশল।
পঞ্চম ধাপ: ফলাফল দেখুন, পরিবর্তন করুন। প্রতি মাসে একবার দেখুন কোন পোস্ট বা বিজ্ঞাপন ভালো কাজ করছে। সেটার মতো আরও করুন। যেটা কাজ করছে না, সেটা বাদ দিন।
যদি এই প্রক্রিয়াটি নিজে পরিচালনা করার সময় বা দক্ষতা না থাকে, তাহলে একটি বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সির সাহায্য নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক পার্টনার আপনার মার্কেটিং বাজেটকে বিনিয়োগে রূপান্তর করতে পারে, খরচে নয়।
শেষ কথা
ডিজিটাল মার্কেটিং কোনো জটিল প্রযুক্তির নাম নয়। এটি আসলে আপনার ব্যবসাকে সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কৌশল যেখানে আপনার গ্রাহক এখন আছেন। আর বাংলাদেশের ৮০ মিলিয়নের বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এখন অনলাইনে আছেন।
আপনার প্রতিযোগিতা ডিজিটালে যাচ্ছে। ক্রেতারা অনলাইনে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। বাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ডিজিটাল মার্কেটিং শুরু করার সবচেয়ে সঠিক সময় ছিল গতকাল। দ্বিতীয় সঠিক সময় হলো আজ।





