বিভিন্ন জাতের আমের নাম ও ছবি: বাংলাদেশের ও বিশ্বের জনপ্রিয় ৫০+ আমের পরিচিতি

বিভিন্ন জাতের আমের নাম ও ছবি

গ্রীষ্মকাল এলেই বাংলাদেশে একটাই আলোচনা এবার কোন আম আগে আসবে? হিমসাগর না গোপালভোগ? এই প্রশ্নটা যে করে, সে নিশ্চিত বাংলাদেশি। কারণ আম এখানে শুধু একটি ফল নয়, এটি একটি আবেগ, একটি সংস্কৃতি, একটি ঋতুবদ্ধ উৎসব।

বাংলাদেশের আম নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু কয়েকটি জাতের নাম বললে চলে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটিতে কেন হিমসাগরের স্বাদ আলাদা হয়, রংপুরের হাঁড়িভাঙার নামের পেছনে কী গল্প আছে, বা ভারতের আলফানসো কেন সারা পৃথিবীতে ‘আমের রাজা’ নামে পরিচিত। এই সব প্রশ্নের উত্তর জানলে আমকে সত্যিকার অর্থে চেনা যায়।

এই সম্পূর্ণ গাইডে আমরা বাংলাদেশের দেশীয় জাত থেকে শুরু করে ভারতের বিখ্যাত জাত এবং বিদেশি হাইব্রিড আম পর্যন্ত ৫০-এর বেশি জাতের পরিচিতি তুলে ধরব। সাথে থাকবে পুষ্টিমান, মৌসুম, উৎপাদন অঞ্চল এবং আম চেনার সহজ কৌশল।

আম কেন এত জনপ্রিয় ফল?

পৃথিবীতে এমন কম ফলই আছে যা এত বিচিত্রভাবে মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে গেছে। কাঁচায় আচার, পাকায় রস, শুকিয়ে আমসত্ত্ব। আম প্রতিটি রূপেই সমান জনপ্রিয়।

আমের উৎপত্তি ও ইতিহাস

আম (বৈজ্ঞানিক নাম: Mangifera indica) পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন চাষের ফল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফলবিজ্ঞানী ও আমবিশারদদের মতে, আমের আদি জন্মভূমি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হিমালয়সংলগ্ন পাদদেশ, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বুনো জাতের আমগাছ প্রথম দেখা গিয়েছিল বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

পৃথিবীতে প্রায় ৩৫টি প্রজাতির আম আছে এবং কয়েকশো জাত রয়েছে। একসময় আম দক্ষিণ এশিয়ার সীমানায় আবদ্ধ ছিল, কিন্তু পর্তুগিজ নাবিকদের মাধ্যমে পঞ্চদশ শতকের পর থেকে আফ্রিকা, ব্রাজিল ও পশ্চিমের দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে আম চাষের গুরুত্ব

বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম সবচেয়ে জনপ্রিয়, এবং দেশের সব ৬৪টি জেলাতেই আম চাষ হয়। বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সর্বাধিক বিখ্যাত। চাষাধীন মোট জমির পরিমাণ, মোট উৎপাদন এবং উৎপাদিত আমের গুণ ও মান বিবেচনায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বাংলাদেশের ‘আমের রাজধানী’ নামে পরিচিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ২৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছে। আম উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ দশের মধ্যে।

আমের নাম, স্বাদ ও মৌসুম (সারসংক্ষেপ টেবিল)

জাতের নামস্বাদের ধরনপাকার সময়প্রধান অঞ্চল
গোপালভোগমিষ্টি, আঁশহীনমে মাসের শেষচাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী
খিরসাপাত/হিমসাগরঅতি মিষ্টি, আঁশহীনজুনের শুরুচাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী
ল্যাংড়ামিষ্টি ও সুগন্ধিজুনের প্রথম সপ্তাহরাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
ফজলিমিষ্টি, বড় আকারজুন-জুলাইচাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী
আম্রপালিমিষ্টি, আঁশহীনজুন-জুলাইসারাদেশ, বিশেষত নওগাঁ
হাঁড়িভাঙামিষ্টি, আঁশহীনজুনরংপুর
আশ্বিনাহালকা মিষ্টিসেপ্টেম্বর-অক্টোবররাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
কাটিমনমিষ্টি-টকসারা বছররাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
গৌরমতিঅতি মিষ্টিমধ্য মৌসুমচাঁপাইনবাবগঞ্জ
আলফানসোঅতি মিষ্টি, ক্রিমিএপ্রিল-মেমহারাষ্ট্র, ভারত
দশেহরিমিষ্টি, সুগন্ধিজুন-জুলাইউত্তরপ্রদেশ, ভারত
কেশরমিষ্টি, জাফরানি রংমে-জুনগুজরাট, ভারত

বাংলাদেশের জনপ্রিয় বিভিন্ন জাতের আমের নাম ও ছবি

হিমসাগর আম

হিমসাগর বাংলাদেশে এই নামেই বেশি পরিচিত, তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর স্থানীয় এলাকায় একে ‘খিরসাপাত’ বলা হয়। ‘খিরসা’ অর্থ ঘন দুধের মালাই এবং ‘পাত’ অর্থ স্তর — আমের শাঁস এতটাই মোলায়েম ও স্বাদে খিরসার মতো যে এই নাম হয়েছে।

আমটি আকারে গোলাকার, মাঝারি আকৃতির, লম্বায় প্রায় ৮ সেন্টিমিটার এবং ওজনে প্রায় ২৬৪ গ্রাম হয়। পাকলে বোঁটার আশপাশ হলুদ রং ধারণ করে। আমটি আঁশবিহীন, রসাল, গন্ধ আকর্ষণীয় এবং বেশ মিষ্টি। গড় মিষ্টতা ২৩ ভাগ। প্রায় দুইশো বছর আগে ময়মনসিংহের মহারাজা সুতাংশু কুমার আচার্য্য বাহাদুর চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে গড়ে তোলা বিশাল আমবাগানে এই জাতের চাষ শুরু হয়েছিল।

২০১৯ সালে এটি ইলিশ ও জামদানির পর বাংলাদেশের তৃতীয় ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জেলার উৎপাদিত আমের প্রায় ৩০ শতাংশই খিরসাপাত জাতের।

পাকার সময়: ২৮ মে থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ

প্রধান অঞ্চল: চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা

ল্যাংড়া আম

ল্যাংড়া নামটি শুনে অবাক লাগে, কিন্তু এর পেছনে একটি মজার ইতিহাস আছে। ভারতের এক খোঁড়া (ল্যাংড়া) ফকিরের আস্তানা থেকে এই জাতের আম প্রথম পাওয়া যায়, সেই থেকে এই নামে পরিচিত।

ল্যাংড়া আম দেখতে সবুজ রঙের, পাকলেও বেশিরভাগ সময় সবুজাভ থাকে। স্বাদে মিষ্টি, সুগন্ধযুক্ত এবং আঁশ কম। মাঝারি থেকে বড় আকারের এই আম বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই সমান জনপ্রিয়।

পাকার সময়: ৬ জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত

প্রধান অঞ্চল: রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ভারতের বেনারস

ফজলি আম

ফজলি আমের নামকরণের পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক গল্প। ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দে মালদহের কালেক্টর র‌্যাভেন সাহেব ঘোড়ার গাড়িতে গৌড় যাচ্ছিলেন। তৃষ্ণায় এক মহিলার কাছে পানি চাইতে গেলে ‘ফজলু বিবি’ নামক মহিলার বাড়ির আঙিনার আম দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করা হয়। সেই থেকে এই আমের নাম ‘ফজলি’।

ফজলি বাংলাদেশের অন্যতম বড় আকারের আম। একেকটি আমের ওজন অনেক সময় ৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি পর্যন্ত হয়। শাঁস হলুদ, মিষ্টি এবং সুগন্ধযুক্ত।

পাকার সময়: ১৫ জুন থেকে জুলাই পর্যন্ত

প্রধান অঞ্চল: চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ

আম্রপালি আম

আম্রপালি আমের নামটি এসেছে প্রাচীন ভারতের এক বিখ্যাত নর্তকীর নাম থেকে। ১৯৭১ সালে ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ড. পিযুষ কান্তি মজুমদার ‘দশেরী’ ও ‘নিলম’ জাতের দুটি আমের সংকরায়ণের মাধ্যমে এই হাইব্রিড জাতটি উদ্ভাবন করেন। বাংলাদেশে এই জাতটি আসে ১৯৮৪ সালে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত মোট আমের ২৫ শতাংশই আম্রপালি জাতের। মাত্র এক দশকে এটি ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া ও গোপালভোগকে পেছনে ফেলে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত আমের জাত হয়ে উঠেছে।

আম্রপালি দেখতে লালচে, মাঝারি আকার, মিষ্টি স্বাদ এবং প্রায় আঁশবিহীন। এটি দেশের ৬৪টি জেলায় উৎপাদিত হচ্ছে, তবে নওগাঁ, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়।

পাকার সময়: ১৫ জুন থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি

প্রধান অঞ্চল: নওগাঁ, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, সারাদেশ

গোপালভোগ আম

গোপালভোগ মৌসুমের প্রথম দিকে বাজারে আসা জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। মাঝারি আকারের এই আম দেখতে হলুদাভ সবুজ। স্বাদে মিষ্টি, আঁশ কম এবং রস বেশি।

বাগান মালিক ও চাষিরা রাজশাহীতে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০ মে থেকে এই আম নামাতে পারেন।

পাকার সময়: মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে

প্রধান অঞ্চল: চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

হাঁড়িভাঙা আম

হাঁড়িভাঙা আমের জন্মস্থান রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানী নামক স্থান। এই আমের ইতিহাসের গোড়াপত্তন করেছিলেন নফল উদ্দিন পাইকার নামের এক বৃক্ষবিলাসী মানুষ। শুরুতে এর নাম ছিল ‘মালদিয়া’।

গল্পটি হলো, আমগাছটির গোড়ায় পানি দেওয়ার জন্য নফল উদ্দিন মাটির হাঁড়ি বসিয়ে ফিল্টার পদ্ধতিতে সেচ দিতেন। একদিন কেউ সেই হাঁড়িটি ভেঙে ফেলে। এই ঘটনার কথা মনে রেখেই গাছটির ফলের নাম হয়ে যায় ‘হাঁড়িভাঙা’।

হাঁড়িভাঙা আঁশবিহীন, মিষ্টি ও সুস্বাদু। এর পাতলা ছাল ও অত্যন্ত ছোট আঁটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি আমের ওজন সাধারণত ২০০-৩০০ গ্রাম। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি GI পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে এই আম থেকে বছরে ২৫০ কোটিরও বেশি টাকার বাণিজ্য হয়।

পাকার সময়: জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই

প্রধান অঞ্চল: রংপুর সদর, মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জ, নীলফামারী, লালমনিরহাট

খিরসাপাত আম

খিরসাপাত এবং হিমসাগর মূলত একই জাতের আম — রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে খিরসাপাত, বাকি দেশে হিমসাগর নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গেও এই আম হিমসাগর নামে বিক্রি হয়।

ফল বিজ্ঞানীদের মতে, খিরসাপাতি জাতের আমগাছে পুরুষ ফুল ৯১ ভাগ এবং উভয়লিঙ্গ ফুল ৯ ভাগ হয় বলে ফলন তুলনামূলক বেশি হয়।

আশ্বিনা আম

আশ্বিনা আমের বিশেষত্ব হলো এর পাকার সময়। বেশিরভাগ আম জুলাইয়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু আশ্বিনা পাকে আশ্বিন মাসে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)। তাই একে নাবি জাতের আম বলা হয়।

রাজশাহীতে নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা নামানো যায়।

পাকার সময়: জুলাই-অক্টোবর

প্রধান অঞ্চল: চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী

বারি আম-৪

বারি আম-৪ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি উন্নত জাত। এটিও দেরিতে পাকে। রাজশাহীতে ১০ জুলাই থেকে এটি নামানোর অনুমতি দেওয়া হয়।

কাটিমন আম

কাটিমন আম থাইল্যান্ড থেকে আসা একটি বিশেষ জাত, যা বাংলাদেশে এখন সফলভাবে চাষ হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বছরে ২-৩ বার ফল পাওয়া যায় — নভেম্বর, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে গাছে মুকুল আসে এবং সেই অনুযায়ী মার্চ-এপ্রিল, মে-জুন এবং জুলাই-আগস্টে আম পাকে। এই কারণে এটি প্রায় বারোমাসি আম হিসেবে পরিচিত।

দেখতে লম্বাটে ও চিকন, খোসা হালকা সবুজ থেকে হলুদাভ। প্রতিটি আমের ওজন ২০০-৩০০ গ্রামের মতো। স্বাদে মিষ্টি ও হালকা টক-মিষ্টির মিশেল। শাঁস গাঢ় হলুদ, আঁশহীন। হর্টিকালচার সেন্টার বনানী, বগুড়ার তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি বাজারে এই আমের দাম ২০০-২৫০ টাকা কেজি পর্যন্ত থাকে।

পাকার সময়: বছরে তিনবার (বারোমাসি)

প্রধান অঞ্চল: রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সারাদেশ

রানী পছন্দ আম

রানী পছন্দ আগাম জাতের একটি আম। রাজশাহীতে ২৫ মে থেকে এই আম নামানো শুরু হয়। মিষ্টি ও সুস্বাদু।

সিঁদুরে আম

সিঁদুরে আমের নাম এসেছে এর উজ্জ্বল লালচে রঙ থেকে। পাকলে এই আমে সিঁদুরের মতো লাল রং আসে। তুলনামূলক ছোট আকারের এই আম দেখতে আকর্ষণীয়।

মল্লিকা আম

মল্লিকা একটি হাইব্রিড জাত — দশেরী ও নিলম জাতের সংকরায়ণে তৈরি। মিষ্টি, আঁশবিহীন এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য।

বোম্বাই আম

বোম্বাই আম সাতক্ষীরা অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়। মিষ্টি ও রসালো এই আমের একটি আলাদা সুগন্ধ আছে।

গৌরমতি আম

গৌরমতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি বিশেষ জাত। অতি মিষ্টি এবং আকারে মাঝারি। মধ্য মৌসুমে পাকে। স্থানীয়ভাবে এই আমের বেশ চাহিদা আছে।\

ভারতের বিখ্যাত বিভিন্ন জাতের আমের নাম ও ছবি

ভারতে বহু ধরনের আম চাষ হয়, তবে আলফানসো, দশেহরি, কেশর, বদামী, চৌসা, তোতাপুরি ও বেনিশান সবচেয়ে পরিচিত জাতগুলোর মধ্যে পড়ে। এসব আমের স্বাদ, ঘ্রাণ, রং, আকার ও ব্যবহারে পার্থক্য রয়েছে। কিছু জাত সরাসরি খাওয়ার জন্য বিখ্যাত, আবার কিছু আম জুস, আচার, পাল্প ও প্রসেসড ফুড তৈরিতে বেশি ব্যবহৃত হয়।

আলফানসো আম

আলফানসো আম, যা হাপুস নামেও পরিচিত, ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রিমিয়াম আমের জাত। মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি ও দেবগড় অঞ্চলের আলফানসো আম বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

এই আমের শাঁস আঁশবিহীন, ক্রিমি, ঘন এবং অত্যন্ত মিষ্টি। এর স্বাদে সাফরান ও মধুর মতো সুগন্ধ পাওয়া যায়। আলফানসো সাধারণত এপ্রিল থেকে মে মাসে পাওয়া যায় এবং ভারত থেকে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। প্রিমিয়াম স্বাদ, মসৃণ টেক্সচার ও শক্তিশালী ঘ্রাণের কারণে একে অনেক সময় “আমের রাজা” বলা হয়।

দশেহরি আম

দশেহরি আম উত্তরপ্রদেশের লখনৌ অঞ্চলের একটি বিখ্যাত ভারতীয় আম। এটি মিষ্টি স্বাদ, সুন্দর ঘ্রাণ এবং কম আঁশের জন্য জনপ্রিয়।

দশেহরি আম সাধারণত সরাসরি খাওয়ার জন্য বেশি পছন্দ করা হয়। এর শাঁস নরম, রসালো এবং সুগন্ধযুক্ত। বাংলাদেশে জনপ্রিয় আম্রপালি জাতটি দশেহরি ও নিলম আমের সংকরায়ণে তৈরি হওয়ায় এই জাতের কৃষিগত গুরুত্বও বেশি।

কেশর আম

কেশর আম গুজরাটের জুনাগড় ও গির অঞ্চলের একটি প্রিমিয়াম আমের জাত। এর শাঁস উজ্জ্বল কমলা হলুদ রঙের, যা দেখতে জাফরানের মতো। এই কারণেই এর নাম হয়েছে কেশর।

কেশর আম মিষ্টি, সুগন্ধযুক্ত এবং ঘন শাঁসের জন্য পরিচিত। এটি সরাসরি খাওয়ার পাশাপাশি আমের পাল্প, জুস, মিষ্টি এবং ডেজার্ট তৈরিতেও ব্যবহার করা হয়। গুজরাটে কেশর আমকে অনেক সময় রাজকীয় আম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বদামী আম

বদামী আম কর্ণাটকের একটি জনপ্রিয় আমের জাত। এটি দক্ষিণ ভারতের আলফানসো নামেও পরিচিত, কারণ এর স্বাদ ও টেক্সচার আলফানসোর সঙ্গে কিছুটা মিল আছে।

বদামী আমের শাঁস মসৃণ, মিষ্টি এবং কম আঁশযুক্ত। এটি দেখতে আকর্ষণীয় এবং খেতে সুস্বাদু। দক্ষিণ ভারতে সরাসরি খাওয়ার জন্য এই আম বেশ জনপ্রিয়।

চৌসা আম

চৌসা বা চাউঁসা ভারত ও পাকিস্তানের একটি বিখ্যাত আমের জাত। এটি অত্যন্ত মিষ্টি স্বাদ, পাতলা খোসা এবং রসালো শাঁসের জন্য পরিচিত।

চৌসা আম পাকার পর হলুদ রঙ ধারণ করে। এর শাঁস নরম, সুগন্ধযুক্ত এবং বেশি রসালো। যারা খুব মিষ্টি আম পছন্দ করেন, তাদের কাছে চৌসা একটি জনপ্রিয় পছন্দ।

তোতাপুরি আম

তোতাপুরি আম দক্ষিণ ভারতের একটি পরিচিত জাত। এই আমের নিচের অংশ তোতা পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকা হওয়ায় এর নাম হয়েছে তোতাপুরি।

তোতাপুরি আমের স্বাদ টক মিষ্টি। এটি সরাসরি খাওয়ার চেয়ে আচার, চাটনি, জুস, পাল্প এবং প্রসেসড আমজাত পণ্য তৈরিতে বেশি ব্যবহৃত হয়। বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াজাতকরণে এই জাতের চাহিদা বেশি।

বেনিশান আম

বেনিশান আম, যা বানগানাপল্লি নামেও পরিচিত, অন্ধ্রপ্রদেশের একটি বড় আকারের বিখ্যাত আম। এটি ভারতের জনপ্রিয় টেবিল ম্যাঙ্গো জাতগুলোর মধ্যে একটি।

এই আমের খোসা হলুদ, আকার বড় এবং শাঁস মিষ্টি ও রসালো। বেনিশান আম সাধারণত সরাসরি খাওয়ার জন্য পছন্দ করা হয়। বড় সাইজ ও ভালো স্বাদের কারণে বাজারে এর চাহিদা বেশি।

ভারতের ঐতিহ্যবাহী আমের বাইরে এখন বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিদেশি ও হাইব্রিড আমের চাষও বাড়ছে। এসব জাতের অনেকগুলো দেখতে আকর্ষণীয়, আকারে বড় এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হওয়ায় কৃষক ও ফলপ্রেমীদের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।

বিদেশি ও হাইব্রিড আমের জনপ্রিয় জাত

বিদেশি ও হাইব্রিড আমের জাতগুলো এখন বাংলাদেশে দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে, কারণ এগুলোর রং আকর্ষণীয়, আকার বড় এবং বাজারমূল্য তুলনামূলক ভালো। পালমার, রেড আইভরি, তাইওয়ান রেড, ব্রুনাই কিং, কারাবাও ও নাম ডক মাই এর মতো জাতগুলো সাধারণত সুন্দর খোসা, মিষ্টি শাঁস, ভালো ফলন এবং বাণিজ্যিক চাহিদার জন্য পরিচিত। কিছু জাত সরাসরি খাওয়ার জন্য ভালো, আবার কিছু জাত ডেজার্ট, জুস, প্রিমিয়াম ফল বাজার এবং বাগানভিত্তিক চাষের জন্য বেশি উপযোগী।

নিচে জনপ্রিয় বিদেশি ও হাইব্রিড আমের জাত, তাদের উৎপত্তি, স্বাদ, রং ও ব্যবহার আলাদা করে তুলে ধরা হলো।

পালমার আম

পালমার আম যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে উদ্ভূত একটি আধুনিক আমের জাত। এটি বড় আকার, লালচে বেগুনি রঙ এবং মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত।

বর্তমানে বাংলাদেশেও পালমার আমের চাষ শুরু হয়েছে। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় বাজারে এর আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে। এটি মূলত টেবিল ম্যাঙ্গো হিসেবে খাওয়ার জন্য উপযোগী।

রেড আইভরি আম

রেড আইভরি থাইল্যান্ডের একটি আকর্ষণীয় আমের জাত। পাকলে এর খোসা লালচে গোলাপি রঙ ধারণ করে, যা অন্য সাধারণ হলুদ বা সবুজ আমের তুলনায় দেখতে বেশি সুন্দর।

এই আম মিষ্টি, সুগন্ধযুক্ত এবং বাজারজাতকরণের জন্য ভালো। রঙ ও আকারের কারণে রেড আইভরি আম ফলের প্রদর্শনী, বাগান চাষ এবং প্রিমিয়াম বাজারে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

তাইওয়ান রেড আম

তাইওয়ান রেড আম তাইওয়ান থেকে আসা একটি রঙিন আমের জাত। পাকার পর এটি গাঢ় লাল রঙ ধারণ করে এবং দেখতে খুব আকর্ষণীয় লাগে।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে এই জাতের আম চাষে আগ্রহ বেড়েছে। বড় আকার, সুন্দর রং এবং ভালো স্বাদের কারণে এটি বাগানভিত্তিক বাণিজ্যিক চাষের জন্য সম্ভাবনাময় জাত।

ব্রুনাই কিং আম

ব্রুনাই কিং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার একটি প্রিমিয়াম আমের জাত। এটি বড় আকার এবং মিষ্টি স্বাদের জন্য পরিচিত।

এই আমের আকার সাধারণ আমের তুলনায় অনেক বড় হতে পারে। তাই ফলপ্রেমী ও বাগান মালিকদের কাছে ব্রুনাই কিং একটি আকর্ষণীয় জাত। বড় ফল, ভালো স্বাদ এবং বাজারমূল্যের কারণে এটি বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময়।

কারাবাও আম

কারাবাও আম ফিলিপাইনের জাতীয় আম। এটি অত্যন্ত মিষ্টি স্বাদ, নরম শাঁস এবং সুগন্ধের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

কারাবাও আম সরাসরি খাওয়ার জন্য খুব জনপ্রিয়। এর শাঁস রসালো, কম আঁশযুক্ত এবং স্বাদে ভারসাম্যপূর্ণ। ফিলিপাইনের রপ্তানি বাজারেও এই আমের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।

নাম ডক মাই আম

নাম ডক মাই থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত রপ্তানিযোগ্য আমের জাতগুলোর একটি। এটি লম্বাটে আকার, হলুদ রঙ, মিষ্টি স্বাদ এবং সুগন্ধযুক্ত শাঁসের জন্য পরিচিত।

থাই খাবারে নাম ডক মাই আমের বিশেষ ব্যবহার আছে। বিশেষ করে ম্যাঙ্গো স্টিকি রাইস তৈরিতে এই জাতের আম বেশি ব্যবহৃত হয়। সরাসরি খাওয়া, ডেজার্ট এবং রপ্তানি বাজারে এই আমের চাহিদা বেশি।

কোন আম সবচেয়ে মিষ্টি?

বাংলাদেশে সবচেয়ে মিষ্টি আমের মধ্যে খিরসাপাত বা হিমসাগর, গৌরমতি, গোপালভোগ এবং হাঁড়িভাঙা বেশি পরিচিত। মিষ্টতা সাধারণত ব্রিক্স স্কেলে মাপা হয়, যেখানে ব্রিক্স মান যত বেশি, আম তত বেশি মিষ্টি। খিরসাপাত বা হিমসাগর গড়ে প্রায় ২৩ ব্রিক্স মিষ্টতার জন্য বাংলাদেশের অন্যতম সেরা মিষ্টি আম হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বব্যাপী মিষ্টি আমের তালিকায় ফিলিপাইনের কারাবাও আম বিশেষভাবে পরিচিত, যার মিষ্টতা প্রায় ২৪ ব্রিক্স পর্যন্ত হতে পারে।

বেশি মিষ্টি আমের তালিকা

মিষ্টতা পরিমাপ করা হয় ব্রিক্স (Brix) স্কেলে। যত বেশি ব্রিক্স মান, তত বেশি মিষ্টি।

খিরসাপাত/হিমসাগরের গড় মিষ্টতা ২৩ ভাগ, যা এটিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে মিষ্টি দেশীয় আমগুলোর একটি করে তোলে। আলফানসো আমের ব্রিক্স মান ১৮-২২ ডিগ্রি। ফিলিপাইনের কারাবাও ২৪ ডিগ্রি ব্রিক্স পর্যন্ত পৌঁছায়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মিষ্টি আমের তালিকায় শীর্ষে আছে খিরসাপাত, গৌরমতি, গোপালভোগ এবং হাঁড়িভাঙা।

কম আঁশযুক্ত আমের তালিকা

আঁশ কম বা একেবারে আঁশহীন আমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হিমসাগর/খিরসাপাত, হাঁড়িভাঙা, আম্রপালি, আলফানসো এবং কাটিমন।

বড় আকারের আমের তালিকা

বড় আকারের আমের মধ্যে সবার উপরে ফজলি — একেকটি ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত হয়। এরপর আছে বেনিশান (অন্ধ্রপ্রদেশ), ব্রুনাই কিং এবং আশ্বিনা।

মৌসুম অনুযায়ী আমের জাত

বাংলাদেশে আমের মৌসুম সাধারণত মে মাসের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত থাকে। পাকার সময় অনুযায়ী আমকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়: আগাম জাত, মধ্য মৌসুমের জাত এবং নাবি বা দেরিতে পাকা জাত। গোপালভোগ ও রানী পছন্দ মৌসুমের শুরুতে আসে, হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি ও হাঁড়িভাঙা জুন থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বেশি পাওয়া যায়, আর আশ্বিনা ও বারি আম ৪ মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে আসে। তাই সঠিক সময়ে সঠিক জাত চিনে কিনলে ভালো স্বাদ, প্রাকৃতিক পাকা আম এবং ন্যায্য দাম পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আগাম জাতের আম

রাজশাহীতে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সবার আগে ১৫ মে থেকে বাজারে আসে গুটি জাতের আম। এরপর ২০ মে থেকে গোপালভোগ, ২৫ মে থেকে লক্ষণভোগ ও রানী পছন্দ বাজারে আসা শুরু করে।

মধ্য মৌসুমের আম

মধ্য মৌসুমে অর্থাৎ জুনের শুরু থেকে জুলাই পর্যন্ত বাজারে থাকে হিমসাগর/খিরসাপাত (২৮ মে থেকে), ল্যাংড়া (৬ জুন থেকে), ফজলি ও আম্রপালি (১৫ জুন থেকে) এবং হাঁড়িভাঙা (জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে)।

নাবি বা দেরিতে পাকা আম

মৌসুমের শেষ ভাগে যে আমগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে আছে আশ্বিনা ও বারি আম-৪ (১০ জুলাই থেকে)। এরা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া যায়।

আমের জাত চেনার সহজ উপায়

রং দেখে চেনার উপায়

রং একটি সহজ কিন্তু সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়। কিছু আম পাকলেও সবুজ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ল্যাংড়া পাকলেও সবুজ রঙ বজায় রাখে। হিমসাগর পাকলে বোঁটার দিক হলুদ হয়। আম্রপালি লালচে রঙ ধারণ করে। সিঁদুরে আম টকটকে লাল হয়।

আকৃতি দেখে চেনার উপায়

ফজলি লম্বাটে ও বড়। হিমসাগর গোলাকার ও নাদুসনুদুস। কাটিমন লম্বাটে ও চিকন। আলফানসো ডিম্বাকৃতি। তোতাপুরি ঠোঁটের মতো বাঁকানো।

ঘ্রাণ দেখে চেনার উপায়

ঘ্রাণ আম চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়। হিমসাগরের গন্ধ স্বতন্ত্র ও আকর্ষণীয়। আলফানসোর ঘ্রাণ সাফরানের মতো। ল্যাংড়া ও দশেহরির নিজস্ব সুগন্ধ আছে যা একবার চিনলে আর ভুল হয় না।

বাংলাদেশের কোন জেলায় কোন আম সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয়?

বাংলাদেশে আম উৎপাদনের প্রধান জেলা হলো নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর ও সাতক্ষীরা। নওগাঁ বর্তমানে আম্রপালি উৎপাদনের জন্য বেশি পরিচিত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ খিরসাপাত, ল্যাংড়া ও ফজলির জন্য বিখ্যাত, রাজশাহীতে গোপালভোগ, হিমসাগর ও ল্যাংড়া বেশি চাষ হয়, রংপুর হাঁড়িভাঙা আমের জন্য পরিচিত এবং সাতক্ষীরায় হিমসাগর, বোম্বাই ও আম্রপালি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদিত হয়। প্রতিটি জেলার মাটি, আবহাওয়া ও চাষের পদ্ধতির কারণে আমের স্বাদ, ঘ্রাণ ও বাজারমূল্যে আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাংলাদেশের ‘আমের রাজধানী’। এখানে প্রায় ২৫০ জাতের আম চাষ হয়। সবচেয়ে সুস্বাদু ও জনপ্রিয় জাত হলো খিরসাপাত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এক বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় তিন লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়।

রাজশাহী

রাজশাহীতে হিমসাগর, গোপালভোগ, ল্যাংড়া ও ফজলি জাতের উৎপাদন বেশি। একটি বছরে রাজশাহীতে প্রায় দুই লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়।

নওগাঁ

বিশেষজ্ঞদের মতে নওগাঁ এখন আম উৎপাদনে প্রায়ই চাঁপাইনবাবগঞ্জকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩ অনুযায়ী আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা নওগাঁ। নওগাঁর প্রধান আম হলো আম্রপালি। এই আমের ওপর ভিত্তি করেই নওগাঁর ব্র্যান্ডিং হয়েছে। এক বছরে নওগাঁয় ৩ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত আম উৎপাদন হয়েছে বলে জানা গেছে।

রংপুর

রংপুর হাঁড়িভাঙা আমের জন্য বিখ্যাত। বর্তমানে রংপুর সদর, মিঠাপুকুর, বদরগঞ্জসহ নীলফামারী, লালমনিরহাট ও দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে হাঁড়িভাঙা চাষ হচ্ছে।

সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরায় হিমসাগর, বোম্বাই ও আম্রপালি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উৎপাদন হয়। প্রায় ৮০ হাজার টন আম এখানে উৎপাদিত হয় এক মৌসুমে।

আম কেনার সময় কী বিষয় খেয়াল করবেন?

প্রথমত ঘ্রাণ নিন। ভালো পাকা আমে বোঁটার কাছ থেকে প্রাকৃতিক মিষ্টি সুগন্ধ আসবে। রাসায়নিক বা অস্বাভাবিক গন্ধ এলে এড়িয়ে যান।

দ্বিতীয়ত, হালকা চাপ দিয়ে দেখুন। পাকা আম হালকা নরম হবে, কিন্তু বেশি পিচ্ছিল হলে বা ভেতরে পচা থাকতে পারে।

তৃতীয়ত, খোসার দিকে লক্ষ্য করুন। মসৃণ খোসা, কোনো কালো দাগ বা অস্বাভাবিক রং না থাকলে আম তাজা। কৃত্রিমভাবে পাকানো আমে অনেক সময় সমান রঙ কিন্তু গন্ধ থাকে না।

চতুর্থত, বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে কিনুন। গাছ পাকা ও ফরমালিনমুক্ত আমের নিশ্চয়তা দেওয়া বিক্রেতাকে অগ্রাধিকার দিন।

আম এ কত ক্যালরি এবং কী ভিটামিন আছে?

প্রথম আলোতে প্রকাশিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম আমে মাত্র ৬০ ক্যালরি থাকে এবং পাকা আমে ৮০ ভাগ পানি থাকে। কোনো কোলেস্টেরল নেই।

পুষ্টিমান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা আমে ২৭৪০ মাইক্রো গ্রাম ক্যারোটিন, ১৪ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৬ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ১৬ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১ গ্রাম প্রোটিন, ০.৭ গ্রাম ফ্যাট এবং ২০ গ্রাম শ্বেতসার রয়েছে। আমে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, ই, কে এবং ফোলেট। এতে ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম এবং ফাইবারও রয়েছে।

দৈনিক চাহিদার ২৫ শতাংশ ভিটামিন ‘এ’ এবং ৭৬ শতাংশ ভিটামিন ‘সি’ আম থেকে মিলতে পারে।

আম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

আম পুষ্টিকর ফল হলেও পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। পাকা আমে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ফাইবার, পটাশিয়াম ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হজম, চোখের স্বাস্থ্য ও ত্বকের জন্য উপকারী। তবে আমে প্রাকৃতিক চিনি বেশি থাকায় অতিরিক্ত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে, বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে। তাই আমের উপকারিতা পেতে হলে জুসের পরিবর্তে সরাসরি আম খাওয়া এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা ভালো।

উপকারিতা

আমে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরকে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও মৌসুমী রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আমের ভিটামিন এ দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আমের আঁশ হজমে সহায়তা করে এবং আমে থাকা পটাশিয়াম রক্তস্বল্পতা দূর করে ও হৃদযন্ত্র সচল রাখে।

এছাড়া আমে ক্যারোটিন, আইসো-কেরোটিন, গ্যালিক এসিড ইত্যাদি এনজাইম ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

অপকারিতা

প্রতি ১০০ গ্রাম আমে প্রায় ১৪ গ্রাম সুগার থাকে, যা তুলনামূলক বেশি। তাই অতিরিক্ত আম খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে পারে, বিশেষত ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আম খেলে ওজন বাড়ে বা ডায়াবেটিসের সমস্যা হয় এমন কোনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। পরিমিত পরিমাণে খেলে আমের উপকারিতাই বেশি। আমের জুস করে না খেয়ে সরাসরি খাওয়া ভালো, কারণ জুসে ফাইবার থাকে না এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেড়ে যায়।

আম উৎপাদনে বাংলাদেশের স্থান কত?

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে আম উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৯ম থেকে ১২তমের মধ্যে। একটি সূত্র জানাচ্ছে অবস্থান ১২তম, অন্য সূত্র বলছে শীর্ষ দশে। আধুনিক পদ্ধতিতে আম চাষ ও উন্নত বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশের আম বিশ্ববাজারে আরও বড় অবস্থান দখল করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা

কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩ অনুযায়ী আম উৎপাদনে শীর্ষ জেলা হলো নওগাঁ। এরপর রয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা এবং সাতক্ষীরা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে দামি আম

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় খিরসাপাত/হিমসাগর এবং হাঁড়িভাঙা। GI পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এই দুটি আমের বাজারমূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কাটিমনের অফসিজন মূল্যও বেশ চড়া পাইকারিতেই ২০০-২৫০ টাকা কেজি।

বিভিন্ন জাতের আম সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় আম কোনটি?

আম্রপালি এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ও বিক্রিত আম। দেশে উৎপাদিত মোট আমের ২৫ শতাংশই আম্রপালি। তবে স্বাদের দিক দিয়ে হিমসাগর/খিরসাপাত মানুষের কাছে বিশেষভাবে পছন্দের।

সবচেয়ে মিষ্টি আমের নাম কী?

বাংলাদেশের মধ্যে খিরসাপাত/হিমসাগর গড় মিষ্টতায় (২৩ ভাগ) সবার আগে। বিশ্বে ফিলিপাইনের কারাবাও আম গিনেস রেকর্ডে সবচেয়ে মিষ্টি হিসেবে স্বীকৃত।

সবচেয়ে বড় আম কোন জাতের?

বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় আম হলো ফজলি। একেকটি ফজলি আম ৫০০ গ্রাম থেকে এক কেজি পর্যন্ত হয়।

হিমসাগর ও খিরসাপাত কি একই আম?

হ্যাঁ, হিমসাগর এবং খিরসাপাত একই জাতের আম। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে একে খিরসাপাত বলা হয়, বাকি দেশে হিমসাগর নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গেও এটি হিমসাগর নামে বিক্রি হয়। ২০১৯ সালে GI পণ্য হিসেবে এটি ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত’ নামে নিবন্ধিত হয়েছে।

হাঁড়িভাঙা আম কোথায় বেশি পাওয়া যায়?

হাঁড়িভাঙা আম রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। বর্তমানে রংপুর সদর, বদরগঞ্জ, নীলফামারী ও লালমনিরহাটেও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে।

বারোমাসি আম কোন জাতের?

বারোমাসি আমের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত জাত হলো কাটিমন (থাইল্যান্ড থেকে আনা)। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি আম-১১ও দেশীয় বারোমাসি আম হিসেবে পরিচিত।

শেষকথা

আম শুধু একটি ফল নয়, এটি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের পরিচয়ের একটি অংশ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাতের গন্ধ থেকে রংপুরের হাঁড়িভাঙার মিষ্টতা প্রতিটি জাতে লুকিয়ে আছে একটি অঞ্চলের মাটির গল্প, একজন কৃষকের পরিশ্রমের ফসল এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক অদৃশ্য ঐতিহ্য।

এই গাইডে আমরা পঞ্চাশটিরও বেশি আমের জাত নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে বাস্তবে বাংলাদেশেই ২৫০-এর বেশি জাতের আম চাষ হয়। প্রতিটি জাতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব মৌসুম এবং নিজস্ব অঞ্চল আছে।

আম কেনার সময় শুধু দাম নয়, জাত ও উৎস জেনে কেনার চেষ্টা করুন। স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি কেনা গেলে সেটাই সবচেয়ে ভালো তাজা ফল পাবেন, চাষি ন্যায্য দাম পাবেন এবং বাংলাদেশের আম শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে

Related Post